গল্প -মাতঙ্গী

ইসস ভাগ্গিস আজকে দত্ত-রা আছে নাহলে এত রাতে একা বাড়ি ফিরতে হতো!”…মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকে মাতঙ্গী!
নাম মাতঙ্গী হলেও, কাজে সে মোটেই মা মাতঙ্গী বা মাতঙ্গিনী নয়! একেবারে ভীতুর ডিম! আজকে স্যার অনেক রাতে টিউশন থেকে ছেড়েছে। তাই ওর মনের মধ্যে বেজার ভয় কীভাবে বাড়ি যাবে। যাই হোক, ও বরং দত্তদের বলবে ওকে একটু এগিয়ে দিতে!
ওমা ক্লাসের বাইরে গিয়ে দেখে সবাই যে যার মতো চলে গেছে! কী করবে এবার সে? মনে মনে ভাবতে লাগলো স্যারকে বলবে কিনা? না থাক, শুধু মুধু স্যার-কে বিরক্ত করা সাজে না, আর বলবেও বা কী? বাবা-মা তো তাকে আনতে আসতে পারবেনা! মা অসুস্থ আর বাবা তখনও অফিস থেকে ফেরেনি; অগত্যা তাকে একাই যেতে হবে – এই ভেবে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে।
টিউশন থেকে মাতঙ্গীর বাড়ির দূরত্ব মাইল সাতেক! তার মানে তাকে অনেকটাই যেতে হবে। যেতে যেতে ভাবতে থাকে বড়ো হয়ে বাবা-মা কে নতুন বাড়ি করে দেবে, মা কে নতুন শাড়ি, বাবার যা চাই সব সব দেবে! পাড়ার সব লোকেরা বলে নাকি সে মায়ের মতো সুন্দর। অন্য মেয়ের মতো না! সামান্য কাজলে সে অনন্যা! সাক্ষাৎ দেবী লক্ষী!

এই তো গেলো আমাদের মাতঙ্গীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিচয়। তবে সে কিন্তু পড়াশোনাতেও সকলের চেয়ে সেরা। বিদেশে পারি দেবে, astronaut হবে সে এই তার ইচ্ছে।
তো এইসব জারপরনাই ভাবতে ভাবতে সে এসে পড়লো চন্ডি তলার কাছে! ছোটোবেলা থেকে তন্ত্রবিদ্যাতে মেয়ের যা ঝোঁক, তাই কোনো মন্দির, বিশেষত কোনো শক্তিপীঠ দেখলে তার প্রণাম না করলে চলে না! সে তখন সব ভুলে মা চন্ডির কাছে হাত জোর করে নমস্কার জানায়, আর বলে -“মা আমার সমস্ত স্বপ্ন পূরণে আমার পাশে থেকো মা…”
“নিশ্চই থাকবে! মা তোর স্বপ্ন পূরণে নিশ্চই থাকবে!” -হঠাৎ করে এক অচেনা গলার আওয়াজে চোখ মেলে দেখলো মাতঙ্গী।
“কী রে! এত রাতে এদিকে? তা বেশ্যাবেত্তি করছিস নাকি আজকাল!”

এই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, মাতঙ্গী ওখান থেকে বেরোবে, এমন সময়…
“হাত ছাড়ো অরিত্র দা, আমি টিউশন থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম…আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি বলো? আমায় তুমি যেতে দাও প্লিজ!”
“প্লিজ? ওরে তোকে সেই ছোটো থেকে খাবো বলে মনটা আমার উতলা আর তুই কি না…”
“না না আমায় যেতে দাও…প্লিজ…না না… মা………..
কিগো তুমি এসে গেছো?
হ্যা কেন?
মেয়েটা যে এখনো বাড়ি ফিরলোনা গো, এতো দেরি তো করেনা!
সেকি!দশটা বাজে.. আচ্ছা দাড়াও!
পাড়ার কিছু ছেলেদের নিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করেন সোমেন বাবু…সোমেন মিস্ত্রি, ওরফে মাতঙ্গির বাবা…
“কী গো খোঁজ পেলে?”
-“না।”
“না মানে? মেয়েটা গেলো কোই তবে?”
-“শুনলাম নাকি রাত ৮.৩০টার সময় ছাড়া পেয়েছে টিউশন থেকে। বাড়ি যেতে যেহেতু দেরী হয়ে যাচ্ছিলো বলে ওর বন্ধুরা সাইকেল নিয়ে যে যার পথে চলে যায়! মাম্মামকে সবাই ওখানেই শেষ দেখে!”
“এবার তবে কী হবে গো? আমার যে সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে!”
-“চিন্তা করো না, পুলিশকে খবর দিয়েছি! ওনারা ঠিক ওর খোঁজ দেবে দেখো!
এই ঘটনার দুদিন পর সারা জায়গা তল্লাশির পর, মালঞ্চ মোড়ে পুকুরের ভিতর একটি বডি সনাক্ত করতে ডাকা হয় মিশ্র দম্পত্তি কে! বডি দেখে সোমেন বাবু ভেঙে পড়লেও মেয়ের এই অবস্থার জন্য কে দায়ী তা ঠাহর করে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মালতি দেবী!
“কেসটা উঠে যাবে তো? দেখো আবার এসব রেপ কেসে যেন ফাসতে না হয়! শালা! সামনে ভোট আর ওই মরণটার এখনই এসব…”
-“দাদা তুমি যদি মেয়েটার ভরা যৌবন টা কে দেখতে… উফফফ মাইরি…”
“চুপপ হতচ্ছাড়া! তোর জন্য আমার যদি…”
-“আরেহ স্যার তড়িৎবরণ মজুমদার কে হারাতে পারে এ পাড়ায় কি আর কেউ আছে নাকি? আপনি খামখা চিন্তা করবেন না তো, কেস টা তো আমার কাছেই আছে নাকি? হ্যাঁ…হাহাহাহা….”
মাস ৬পর —
“এ কী হল গো আমার…আমার ভাইটাকে এরম করে কে হত্যা করলো…সারা শরীর থেকে রক্ত শুষে…হায় রে…”
-“স্যার আপনি চিন্তা করবেন না আমি এই খুনের কিনারা করবোই…”
বলতে না বলতেই…”ধর ধর ধর” – পাড়ার কিছু লোক এসে ওদের ওপর পাকড়াও করে এবং তাদের অনবরত ইট বর্ষনের মাধ্যমে শেষ হয় তড়িৎ বাবু এবং তার চামচা পুলিশ বিজয়কৃষ্ণ ভদ্র।
কিন্তু এমন টা হলো কী করে? তা জানতে হলে যেতে হবে – ৬মাস আগের সেই রাতে, যেদিন মাতঙ্গীর ডেডবডি পাওয়া গেলো…
“মেয়েটা আমার এভাবে চলে গেলো…কেন কেন কেন ঠাকুর? কী পাপ করেছি আমরা? এমন শাস্তি কেন দিলে আমায়…কেন? একি কোথায় চললে?”
-“তুমি চাও তো আমাদের মেয়ের খুনির বিচার হোক?”
“হ্যাঁ চাই কিন্তু…”
-“তবে আগামী ৬মাস আমার আর কোনো খোঁজ করোনা!”
মালতি দেবী আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মালঞ্চর মন্দিরে ছদ্দবেশে শুরু হল তার দশমহাবিদ্যা, বগলামুখীর আরাধনা। মা বগলামুখীর আরাধনায় যখন মা তুষ্ট হয়, তখন হঠাৎই একদিন সেই পাথরের দেবী মূর্তি প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে! হয়তো মায়ের আগুন তার ফুলের মতো মেয়েটির জন্যই! মাতঙ্গীকে মা বগলামুখী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন তার শত্রুদের সমূলে নাস করার জন্য…
“আঃ উফফ…আরে কি করছো ছাড়ো! আআআ…”
-“কি হল?”
“পিছনে দেখো…”
পিছনে দরজায় মাতঙ্গী কে উলঙ্গ দেখে ভয়ে শিহরিত হয়ে যায় অরিত্র!
“একি তুমি? তোমাকে তো আমি…”

“আমাকে তুমি…কী?”
“না না শোনো মাতঙ্গী…আহ্হ্হঃ…না…”
যে নৃশংসতার সাথে অরিত্র মাতঙ্গীকে শেষ করে দিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তার পুরুষাঙ্গ কাটতে থাকে মাতঙ্গী…কেটে সেই অন্ধকারে বডিটা রাস্তায় ফেলে দেয় সে! রাস্তার কুকুর গুলো সেই শরীরটাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে থাকে…আনন্দে উচ্ছাসে মা বগলামুখীর উদ্দেশে প্রণাম জানায় সে!এবার তাঁর মুক্তি।
“মা…তোমার সাধনা পূর্ণ মা…”
চোখ খুলতেই মেয়েকে সামনে দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারেনা মালতি দেবী…
“মা চলো এবার আমরা যাই মা…”
-“হ্যাঁ মা চল…কিন্তু তোর বাবা?”
“আসার সময় বাবাকে প্রমান দিয়ে এসেছি মা…বাবা শেষ কাজটুকু করে দেবে।”
এই বলে দুই মা মেয়ে অন্ধকারে লিপ্ত হলো! দেবী মূর্তিটিও এতক্ষনে শীতল করুণ রূপ নিলো!
কিছু মাস পর –
সোমেন বাবু গঙ্গায় মা মেয়ের অস্থি বিসর্জন দিয়ে ফেরার পথে…
“কাকু একটা বিস্কুট দেবে?”
“হ্যাঁ রে মা…দাঁড়া…”
বিস্কুট কিনে দেওয়ায় পরম আনন্দে খেতে থাকে মেয়েটি।
রাস্তার মেয়েটিকে নাম, ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে সে অনাথ শিশু বলে পরিচয় দেয় নিজেকে!
“আমার সাথে যাবিরে মা? আমারও না কেউ নেই রে মা…”
শুনেই সে বলে উঠল, “যাবো বাবা!”
শুনে সোমেন বাবু পরম তৃপ্তিতে বলে উঠলেন, “আচ্ছা বেশ তবে আজ থেকে তুইই আমার মাতঙ্গী! চল মা!”