গল্প -বেটি

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। ধাম সুন্দরবনের একটি অখ্যাত গ্রাম।বাবা ছিলেন ডাকুনিতে একটি বিখ্যাত বিস্কুট কোম্পানির প্রোডাকশন হেড। সেই সূত্রে আমার শৈশব,যৌবন সবকিছুই কলকাতাতে কেটেছে। তখন আমি নতুন চাকুরীর জন্য মুম্বাইয়ে।

বাবা কিছুদিন হলো কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। মা বেশ কয়েকবছর আগেই গত হয়েছেন। আমি মুম্বাই চলে যাওয়ার পরে বাবা কলকাতায় বড়ই একাকী হয়ে পড়েন।
একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাবা গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন।

খুশিই হয়েছিলাম আমি। কলকাতার শহুরে জীবন বড়ই যান্ত্রিক বড়ই স্বার্থপর। পাশের বাড়ির কারোর কোনো বিপদ হলে দেখা তো দূরের কথা, কেউ চোখ তুলে তাকাতোও না।
সেদিক থেকে গ্রাম অনেক ভালো। সেখানে অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও ছিল বুকভরা ভালোবাসা। সকাল বিকাল বাবা অন্তত গল্প করার লোক পেতেন।
তাছাড়া একটি বিশেষ কারণও ছিল।

আমাদের পরিবার কালী-ভক্ত। গ্রামের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তি ছিল। প্রতিবছর খুব বড় করে কালী পুজো হয়। প্রতিবছর আমার যে যেখানে থাকি না কেন, কালীপুজোর দিন সবাই গ্রামের বাড়িতে ফিরতাম। এটাই আমাদের বাড়ির অলিখিত নিয়ম।
তাছাড়া বাবা ছোটবেলা থেকে চরম কালীভক্ত। প্রতি অমাবস্যায় বাবা মাকালীকে ভোগ নিবেদন করে তবে অন্ন গ্রহণ করতেন।
মায়ের ভোগ অপূর্ব বানাতেন বাবা। চিড়ে, দই, নারকেল, ডাবের জল দিয়ে তৈরি সেই ভোগের স্বাদ ছিল স্বর্গীয়।

কালীভক্ত বাবা নিজের শেষ জীবন মায়ের আরাধনায় নিজেকে সপে দিতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি যখন গ্রামের বাড়িতে চলে আসতে চাইলেন, তখন আমরা আর বাঁধা দিলাম না। তাছাড়া গ্রামে জেঠু-কাকুরা থাকতেন। জানতাম ওনার দেখভালের কোনো অসুবিধা হবে না।
এবার আসল ঘটনায় আসা যাক….
সেবছর কার্ত্তিকমাসে কালীপুজো পড়েছিল। অমাবস্যা এমনভাবে পড়েছিল যাতে দুদিন ই পুজো সম্ভব।
ভূত-চতুর্দশীর সন্ধ্যায় আমি মুম্বাই থেকে কলকাতায় ফিরি। প্ল্যান ছিল আমি রাতটা কোলকাতার বাড়িতে কাটিয়ে সকালেই গ্রামের বাড়ি যাবো। জানতাম আজ আমাদের বাড়িতে পুজো হবে না। কাল হবে।
কিন্তু মন মানলো না। রাতে শিয়ালদহ থেকে শেষ ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরবো মনস্থির করলাম।
শেষ ট্রেনে যখন আমার স্টেশনে পৌছালাম তখন রাত ১.৩০ টা। পা-ভ্যানে আধঘণ্টা এসে আমার গ্রামের পথ ধরলাম। এবার হাঁটা পথ। অমাবস্যার ঘন অন্ধকার চারিদিক কালো আলকাতরার মতো ছেয়ে রেখেছে।প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কোনরকমে হাতড়াতে হাতড়াতে হাঁটতে লাগলাম।
বেশ খানিকটা হাঁটার পর, গ্রামের বাইরে আমাদের ধান-রাখার খামারের কাছে এসে পড়লাম।আর একটু গেলেই আমাদের বাড়ি। খামারে কিছুক্ষন থামলাম। পথশ্রমে বেশ ক্লান্ত ছিলাম। ভাবলাম একটু দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেওয়া যাক।

হঠাৎ সামনে “হাম্বা, হাম্বা” ডাক শুনে চমকে উঠলাম। দেখি একটা বাছুর আমার সামনে দাঁড়িয়ে। গা টা ভয়ে কেমন শিরশির করে উঠলো। কৈ একটু আগে ওখানে তো কিছুই ছিল না। তাহলে বাছুরটা এলো কোথা থেকে। তাছাড়া এতো রাতে কে বা বাছুর বাইরে ছেড়ে রাখবে????
রেডিয়াম দেওয়া হাতঘড়িতে দেখলাম রাত ২.৩০। বাবার কাছে শোনা গ্রামের ভয়ানক গো-ভূতের গল্প মনে পড়ে গেল। যারা মায়া বিছিয়ে পথভ্রান্ত পথিকদের মেরে ফেলে।
তবে কি ওই বাছুরটা গো-ভূত???
ভয়ে আমার হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে গেল।
তবে এই ভয়, এই আতঙ্ক সাময়িক। আমার বিজ্ঞানমনস্ক মন এই ভয়কে বেশিক্ষণ পাত্তা দিলো না।
ভাবলাম কারোর বাছুর হয়তো গোয়াল থেকে কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছে। কাল সকালে এর মালিক যখন খুঁজে পাবে না, তখন আবার চেঁচামেচি শুরু করবে।
ভাবলাম বাছুরটাকে নিয়েই গ্রামে ফিরবো।
নীচু হয়ে বাছুরটাকে ধরতে যাবো, ঠিক সেইসময় আমার পিঠে প্রচন্ড একটা চাপড় খেলাম।
খুব জোরে! ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলাম।
পিছন ফিরে দেখি একটা অতি সুন্দর বাচ্চা মেয়ে লালপেড়ে সাদা শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের ঘন অন্ধকারেও তার মুখের ঔজ্জ্বল্য পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। তন্ময় হয়ে দেখছিলাম তাকে। কে ইনি? কোনো মানব-শিশু না কি কোন মানবীরূপী দেবী???
“ও বিশুকাকু কি দেখছো? বাড়ি চলো। বাড়ি যাবে না???”
মেয়েটির কথায় আমার তন্ময়ভাবটা কাটে।
সামনে তাকিয়ে দেখি সেই বাছুরটা অবিশ্বাস্যভাবে উধাও হয়ে গেছে।

“চলো, বিশুকাকু তাড়াতাড়ি চলো। আমার খুব খিদে পেয়েছে। জানো দাদু আজকে ভোগ তৈরী করেছে। দাদুর কাছে চাইলাম, বললো আগে তোর বিশুকাকুকে এগিয়ে নিয়ে আয়, তারপর ভোগ খাবি! দাদু দারুন ভোগ তৈরি করে। কখন থেকে বসেছিলাম ভোগ খাবো বলে, তবু দাদু দিলো না।”
বালিকার গলায় অভিমানের সুর ফেটে পড়ে।
অবাক হই আমি। বাবার ছেলেমানুষী আর গেল না। এতো রাতে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে একটা ছোট্ট মেয়েকে পাঠিয়েছেন। না বাবাকে এবার একটু বকাঝকা করতে হবে। যত বয়েস বাড়ছে, তত ওনার ছেলেমানুষী উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
চিন্তাটা শেষ হয় না আমার,বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই আমি,

“বাবা আমার আজকে আসার কথা কিভাবে জানলেন??? আমি তো ফোন করে কাল আসবো বলেছিলাম। তবে???
“ও বিশুকাকু কি চিন্তা করছো? কিছু চিন্তা করতে হবে না। দাদু সব জানে। চলো বাড়ি যাই! বললাম না আমার খুব খিদে পেয়েছে। চলো তাড়াতাড়ি।”
আবারও অবাক হই আমি, মেয়েটা কি মন পড়তে পারে নাকি??? কে জানে??আজ যা আমার সাথে ঘটছে তার কোনো মাথামুন্ডু কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না।।।
মেয়েটির কথাটার মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন আদেশ জড়িয়ে ছিল, যেটাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিল না।
তার একটা হাত ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার সাথে চলতে লাগলাম।
যেতে যেতে বিভিন্ন কথা বলতে লাগলাম তার সাথে।
কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম,
“তোমার নাম কি?”
উত্তরে সে হেঁসে বললো,
“আমার নাম “তারা” গো।”
বললাম,
“তারা! তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না, তোমার বাবার নাম কি?”
“আমার বাবার নাম অনাথবন্ধু গো।”
অবাক হলাম আমি। প্রতিবছর আমি গ্রামে আসি। গ্রামের প্রায় সবাইকে চিনি। কিন্তু অনাথবন্ধু নামে কাউকে তো চিনি না।
জিজ্ঞাসা করতেই যাচ্ছিলাম,তার আগেই মেয়েটা বলে উঠলো,
“আরে দীননাথ আছে না, ওর ছেলে অনাথবন্ধুর মেয়ে আমি। ভালো করে মনে করো তুমি ওদের চেন”
আর প্রসঙ্গ বাড়ালাম না, কথা ঘোরানোর জন্য জিজ্ঞাসা করলাম,
“তোমাদের বাড়ি কোথায় গো??”
উত্তরে মেয়েটি একটু রেগেই বললো,
“উফ! তুমি বড্ড প্রশ্ন করো, আমার বাড়ি তোমাদের সদর- পুকুরের ওপারেই”।
ভয়ানক অবাক হই আমি। আমাদের সদর-পুকুরের ওপারে কোনো বাড়িই নেই। কেবল একটা কালী-মন্দির আছে।

কথাটা বলতেই যাচ্ছিলাম।
কিন্তু তার আগে মেয়েটি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
“আর কোনো কথা নয় বিশুকাকু! আমার খুব খিদে পেয়েছে! আর থাকতে পারছি না! ওই দেখো কি সুন্দর ভোগের গন্ধ বেরোচ্ছে!!”
দেখলাম আমি আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে।
মেয়েটি আমার হাত ধরে টেনে বাড়ির মধ্যে ঢোকালো।
দেখলাম বাড়িতে পুজো হচ্ছে। বাড়ির সবাই পুজো দেখছে।
বাবা নিজের হাতে মায়ের আরতি দিচ্ছিলেন। সামনে মায়ের ভোগ সাজানো।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
খানিক পড়ে বাবার আরতি শেষ হলো।
বাবা ঠাকুরের দিক থেকে মুখ না ঘুরিয়ে বলে উঠলেন,
“এসেছিস খোকা! জানতাম তুই আসবি! আজ রাতটা ভালো নয় বুঝলি! তাইতো বেটিকে পাঠালাম তোকে এগিয়ে নিয়ে আসতে। কখন থেকে সে ভোগ খাবে খাবে বলে বায়না করছিল! বললাম আগে খোকাকে এগিয়ে নিয়ে আয়, তারপর ভোগ পাবি…..
বাড়ির সবাই যারা এতক্ষন পুজো দেখছিল তারা আমার দিকে ঘুরে তাকালো।
তারাও এতক্ষন আমার উপস্থিতি টের পাইনি। তাহলে বাবা পেলেন কিভাবে????
বাবা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। হাঁসি মুখে আমার দিকে তাকালেন।
আর ঠিক সেইসময় আমার চোখ চলে গেল দেবী-মূর্তির মুখের দিকে।
আরে এই মুখটা তো আমি চিনি। এই মুখ আর কারোর নয়, এই মুখটা তো তারার…..
চকিতে পিছন ফিরি আমি। দেখি আমার পিছনে কেউ নেই। কেবল মাটিতে ছোট ছোট আলতা পড়া পায়ের ছাপ পড়ে আছে। ধীরেধীরে সেগুলো আমার চোখের সামনে থেকে বিলীন হয়ে যেতে লাগলো!!!!
আমার আর কিছুই বোঝার অবশিষ্ট রইলো না…..
তখনও আমার কানে একটাই কথা ভেসে বেড়াচ্ছে,
“আমি দীননাথের ছেলে অনাথবন্ধুর মেয়ে তারা গো!”

Leave a Comment