গল্প -জন্মদিন

ছয় বছরের হিয়া জানেনা মায়ের স্নেহ ভালবাসা কি জিনিস।তবে সে এটুকু জানে মা খুব মূল্যবান সম্পদ।আশ্রমের দিদিদের সাথে স্কুল যেতে যেতে কতোবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে সন্তানের হাত ধরে,পরম মমতায় চুল ঠিক করে দিতে দিতে হেঁটে যাওয়া মায়েদের দিকে।কখনো দিদিরা বিরক্ত হয়ে বলেছে-“হিয়া,রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এইভাবে অন্যমনস্ক হয়ে কি দেখছিস তুই?”
হিয়া অস্ফুটে শুধু একটা কথাই বলেছে-“মা দেখছি।”

দিদিরা বোঝে হিয়ার কষ্ট,তাই হাত ধরে শান্তনা দিতে দিতে স্কুলে নিয়ে গেছে।ছোট্ট হিয়ার খুব প্রিয় দুটো জিনিস হল ওর পুতুল আর সুন্দর একটা ডায়েরি।দুটোই ওকে দিয়েছিল ভালো দিদি।কখনো কাছছাড়া করেনা হিয়া এ দুটো জিনিস।
আশ্রমের এই ভালো দিদি হল এই অনাথ আশ্রমের সবার দিদি।এই আশ্রমের মালিকের একমাত্র মেয়ে।প্রায়ই এসে সে হিয়াদের সাথে সময় কাটায়,কখনো টিভিতে ভালো সিনেমা চালায় আর মাঝে মাঝে ওদের জন্য আনে খেলনা কিম্বা খাবার।আগে কেউ একজন ভালো দিদি বলে ডাকতো দিদিকে।তারপর থেকে দিদি সবার ভালো দিদি হয়ে গেছে।আশ্রমের সবার আব্দার মেটানোর চেষ্টা করে দিদি।সবাই খুব ভালোবাসে দিদিকে।দিদির যখন কলেজের পরীক্ষা চলে দিদি আসতে পারে না আশ্রমে,তখন সবার মন খুব খারাপ থাকে।এ আশ্রমের সবাই সবাইকে বেশ ভালো ভাবে বোঝে।বড়রা ছোটদের স্নেহ, মমতা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করে। এছাড়া সবাই নিয়ম মাফিক খাওয়া,প্রার্থনা ঘুম,স্কুল যাওয়া এসব মেনে চলে।
হিয়া এ আশ্রমে এসেছে ঠিক ছয় বছর আগে‌‌।জন্মের পর এক অন্ধকার রাতে হিয়ার জায়গা হয়েছিল অন্ধকার গলির মধ্যে নর্দমার পাশে।ছোট্ট হিয়া সেদিন অনেক কেঁদেছিল,কিন্তু মাকে পায়নি।শুনেছিল শুধু গলির মধ্যে দিয়ে যাওয়া রিক্সার শব্দ আর কুকুরের ডাক।পরের দিন আলো ফুটলে সবাই ড্রেনের পাশে হিয়ার কাপড় জড়ানো ছোট্ট শরীরটা দেখতে পায়।পুলিশে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাওয়া হিয়াকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আর সেই থেকে হিয়ার ঠিকানা এই অনাথ আশ্রম।
হিয়াকে ডেকে একদিন আশ্রমের ম্যাডাম বলেছিলেন-“হিয়া তোমার ডেট অফ বার্থ টা লিখে রাখো খাতায়।”
হিয়া মানে জিজ্ঞেস করতে,ম্যাডাম বলেছিলেন-“তার মানে হল ওই বছর ওই মাসের ওই নির্দিষ্ট দিনটাতে তুমি জন্মেছিলে।”

তারপর হিয়াকে আদর করে বলেছিলেন-” তারমানে ওটা হল তোমার জন্মদিন।”
হিয়া খুব খুশি এখন হিয়াও তো জেনে গেছে ওর জন্মদিনটা।হিয়া দেখেছে স্কুলে অনেক বন্ধুরা জন্মদিনের দিন কেক, লজেন্স এসব সবাইকে দেয় আর হিয়ারা তাদেরকে উইশ করে।এই সেবার হিয়ার সব বন্ধু আর হিয়াও তো গেছিল মিতিনের জন্মদিনে।আশ্রমের সবাইকে নিমন্ত্রণ করেছিল ওর মা।হিয়া দেখছিল মিতিন কি সুন্দর একটা পোশাক পরে এসে মায়ের হাত ধরে কেক কাটলো,আর ওর মাও ওকে কতো আদর করলো চুমু খেলো ওকে।হিয়া শুধু মিতিন আর ওর মাকে দুচোখ ভরে দেখছিল কেক খাওয়ার কথা ভূলে গিয়ে।
হিয়া হিসাব করে দেখেছে আর তিন মাস দু দিন পর ওর জন্মদিন,ওর বয়স সাত হবে। কিন্ত হিয়া ছাড়া তো কেউ জানে না সেটা কে বা উইশ করবে তাকে?একজন অবশ্য জানতে পারে সেটা হিয়ার মা।কিন্ত হিয়ার তো মা’ই নেই তাহলে?হিয়ার খুব মন খারাপ হয় এসব ভেবে।হিয়া রোজ হিসাব করে ক্যালেন্ডার মিলিয়ে জন্মদিন আর কতোদিন বাকি সেটা।এইভাবে হিয়ার জন্মদিন চলে এলো।

জন্মদিনের দিন হিয়া ঘুম থেকে উঠে একবার ক্যালেন্ডারটা মিলিয়ে নিল।হ্যাঁ ঠিক,আজই হিয়ার জন্মদিন।তারপর হিয়া পড়তে বসলো সবার সাথে।আজ আর পড়ায় মন বসছে না ওর।হিয়া নিজের ডাইরি খুলে একটা কেকের ছবি আঁকলো,নিচে নিজেই লিখলো-“হ্যাপি বার্থডে হিয়া,আজ তোমার জন্মদিন।”
হঠাৎ হিয়াকে স্নান করার জন্য ডাকা হল।হিয়া উঠে যেতেই হিয়ার পাশে পড়তে বসা ওর থেকে দু বছরের বড় প্রিয়াঙ্কার চোখ গেলো হিয়ার ডায়েরির দিকে।প্রিয়াঙ্কা আস্তে আস্তে বললো-“তারমানে আজ হিয়ার জন্মদিন?”
সবার মধ্যে ফিসফিস শব্দে শুরু হল আলোচনা।কেউ বললো-“আস্তে বল হিয়া যদি শুনে ফেলে!”
কেউ বললো-“ভালো দিদিকে বলতে হবে আজ এলে।”

কিছু সময় পর সবাই মিলে চলে গেলো স্কুলে।আশ্রম় প্রায় ফাঁকা ‌এখন।স্কুলে গিয়ে আজ হিয়া অন্যমনস্ক থাকার জন্য বকা খেলো।মন নেই তার ক্লাসে।ছুটির পর ঘরে ফিরে মুখ হাত ধুয়ে হিয়া রোজ খেলে বন্ধুদের সাথে।আজ আর ইচ্ছে করছে না হিয়ার খেলতে। নিজের পুতুলটা নিয়ে চুপচাপ বসে,সবার খেলা দেখছে হিয়া।আজ অনেকেই খেলছে না।গেটের সামনে ভালো দিদির স্কুটিটা দাঁড় করানো মানে ভালো দিদি এসেছে।আসুক আজ আর ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না হিয়ার।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে একটু পর বেল বাজলে খেলা শেষ করে পড়তে বসতে হবে সবার। হঠাৎ পিছন থেকে এক দিদির ডাক শুনে চমকে উঠলো হিয়া।দিদি বললো-“তোকে ভালো দিদি ডাকছে,ঘরে চল।”
হিয়া উঠে দাঁড়িয়ে দেখলো আজ ঘন্টা পড়ার আগেই মাঠ পুরো ফাঁকা।ঘরে ঢুকতেই দেখলো সারা ঘরে প্রচুর ভিড়।তাহলে কি আজ ভালো দিদি সবাইকে উপহার দেবে?দুটো দিদি হাত ধরে হিয়াকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়‌ করালো হিয়ার ছোট্ট খাটটার সামনে।এ কি দেখছে হিয়া স্বপ্নের মতো লাগছে সবকিছু।পুরো ঘরটা বেলুন দিয়ে সাজানো।সামনের টেবিলে একটা সুন্দর কেক।সবাই আছে সেখানে।সবার মুখে হাসি,সবাই হিয়াকে হ্যাপি বার্থডে বলছে।হিয়ার তো খুব খুশি হওয়ার কথা কিন্তু হিয়ার কেনো হাসি পাচ্ছে না এখন? খুশিতে লাফাতে ইচ্ছে করছে না তো হিয়ার!পরিবর্তে ছোট্ট হিয়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো আনন্দে।সবাই কতো আদর করছে হিয়াকে কেক খাওয়াচ্ছে।সারা আশ্রম় জুড়ে হইহই কান্ড।ভালো দিদি আর অন্য দিদিরা হিয়াকে অনেক আদর করলো।রান্নার মাসি আজ চিকেন রান্না করছে তার গন্ধ বেশ ভালোই পাওয়া যাচ্ছে।আজ চিকেনের সাথে সাথে সবাই পায়েস খেলো।আর হিয়াকেও খুব সুন্দর করে থালা সাজিয়ে খাওয়ালো ভালো দিদি।আজ ভালো দিদিকে কেমন জানি মা মা মনে হচ্ছে হিয়ার।আজ জন্মদিনের দিন ছোট্ট হিয়া খুব খুশি।

Leave a Comment