হারিয়ে যাওয়া

আশ্বিনী শরতের কাশবনের মায়া আজ‌ও ছাড়তে পারেনি আবীর। এই মফস্বল শহরের কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছে সে আজ বছর দুয়েক। তরুণ এই অধ্যাপকটি ছাত্রছাত্রীদের বড়োই প্রিয়। আবীরের অধ্যাপনায় আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকে। শেলী, বায়রনের কবিতা তার ক্লাসে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। ওয়ার্ডস‌ওয়র্থ পড়াতে পড়াতে সে গোটা ক্লাসকে নিয়ে পৌঁছে যায় প্রকৃতির কোলে। কবিতার জগতে যেন আবীর নিজেকে হারায়। ঘন্টা পড়ে যায়, তবু তার ক্লাস শেষ হয় না। দরজায় পরবর্তী ক্লাসের অধ্যাপকের ছায়া পড়লে সম্বিত ফেরে আবীরের।

তবুও ক্লাস আর কলেজের মিটিং বাদ দিয়ে সময় পেলেই সে তার সাইকেলে চড়ে বসে। প্রথমে পিচ রাস্তা, তারপর গ্রাম্য মেঠো পথ। কিলোমিটার চারেক পথ উজিয়ে সে হাজির হয় নদীটার ধারে। শিবু মাঝি কলেজের এই মাস্টারটিকে ভালোই চিনে গেছে। প্রায় দিন‌ই শেষ-দুপুরে এসে হাজির হয় মাস্টার। সাইকেলটা ঘাটের ধারে তালা মেরে রেখে চড়ে বসে নৌকায়। শিবু একটা বিড়ি ধরিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়। বর্ষার আগে এ নদীতে জল‌ই থাকে না। তখন হেঁটেই পার হয় লোকজন, গোরুর গাড়ি। বর্ষা আর শরতে‌ই নদীতে জল থাকে। তখন‌ই শিবু নৌকা নামায়। মাস্টারের সাথে তার বেশ জমে। মাস্টার তাকে শুধায়, তার বাড়ির খবর, বছরের অন্য সময়ে তার কাজ-কারবারের খবর। গল্প করতে করতেই তারা পৌঁছে যায় সেইখানে, শিবু জানে ঠিক যেখানটায় মাস্টার নামবে। নদীর এই জায়গাটায় বেশ ঘন কাশবন। উঁচু পাড়টায় উঠে যায় আবীর। শিবু ফিরে যায় নৌকা নিয়ে। সে জানে আকাশে যখন অস্তরাগের সুর বাজবে, তখন আবার তাকে আসতে হবে মাস্টারকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।

উঁচু পাড়টায় উঠে এসে বসে আবীর। কাঁধের সাইড ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রাখে। আর তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সাদা হয়ে থাকা অন্যপাড়টার দিকে। বাতাসের দোলায় কাশবনে আলোড়ন ওঠে। কত স্মৃতি বুকে দোলা দিয়ে যায় আবীরের।
সেটা ছিল অনার্সের ফার্স্ট ইয়ার। প্রফেসর বোস একদিন ক্লাসে এসে ‌এলিজাবেথ ব্রাউনিংএর একটা কবিতা পড়তে ডাকলেন আবীর আর তাদের ক্লাসের আর একটি মেয়েকে। স্যার কবিতাটা একবার পুরুষ কন্ঠে একবার নারীকন্ঠে শুনতে চেয়েছিলেন। আজ‌ও মনে আছে পুরো কবিতাটা।

When our two souls stand up erect and strong,
Face to face, silent, drawing nigh and nigher,
Until the lengthening wings break into fire
At either curvèd point,—what bitter wrong
Can the earth do to us, that we should not long
Be here contented? Think. In mounting higher,
The angels would press on us and aspire
To drop some golden orb of perfect song
Into our deep, dear silence. Let us stay
Rather on earth, Belovèd,—where the unfit
Contrarious moods of men recoil away
And isolate pure spirits, and permit
A place to stand and love in for a day,
With darkness and the death-hour rounding it.

সেদিন‌ই ক্লাসের পরে ক্যান্টিনে মেয়েটির সাথে পরিচয়। ওর নাম মঞ্জুলিকা। দু’জনেই কবিতা ভালোবাসে। আর ভালোবাসে প্রকৃতি। বন্ধুত্ব হতে দেরী হল না ওদের। কয়েকদিনের মধ্যেই ওরা যেন জোড় বেঁধে গেল। কলেজের মাঠে বা লাইব্রেরীতেও ওদের দেখা যেত, কখন‌ও ইয়েটস কখন‌ও বা জীবনানন্দ নিয়ে গভীর আলোচনায় ডুবে। সেখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। ক্রমশঃ বন্ধুত্ব হল প্রগাঢ়। কলেজের পাশেই গঙ্গা। ঘাটের নৌকায় একটাকা দিয়ে দুটো টিকিট কেটে হারিয়ে যেত ওরা পরিচিত চোখগুলোর আড়ালে, ওপারে বসন্ততলার গ্রামের ভিতর। সেখানে দীঘির ধারে কাশবনের ভিতর গিয়ে জমত ওদের কবিতা-গল্প। তারপর কখন যেন হাতে হাত রাখা… কাঁধে মাথা রেখে অনাগত জীবনের স্বপ্ন দেখা। কাশফুলের সাদারঙের প্রেক্ষাপটে ওদের স্বপ্নগুলো কত রঙীন দেখাত।

ফার্স্ট ইয়ারের শেষে ছুটি পড়ল। হস্টেল ছেড়ে ফিরে গেল যে যার বাড়ি। সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরুর দিন একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট কিনে নিয়ে এল আবীর, মঞ্জুলিকাকে দেবে বলে। কিন্তু মঞ্জুলিকা এল না সেদিন। খুব হতাশ হয়ে আবীর র‌ইল পরের দিনের অপেক্ষায়। পর পর কয়েকটা দিন সে খুঁজে পেল না মঞ্জুলিকাকে। এত বড়ো ক্লাসঘরে ইংলিশ অনার্সের এত ছেলেমেয়ের মাঝেও তার নিজেকে ভীষণ ভীষণ একা লাগল। গোটা ক্লাসঘরটা যেন তার কাছে শূন্যগর্ভ, ফাঁপা বলে মনে হতে লাগল। প্রফেসর বোসের ক্লাস, যা করবার জন্য সব ছাত্রছাত্রী মুখিয়ে থাকত, সেই স্যারের জলদগম্ভীর কন্ঠ‌ও যেন তার কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকল। কি অসহ্য প্রতীক্ষা নিয়ে সে ক্লাস করে চলল। কিন্তু মঞ্জুলিকা আর এল না।
দিন পনেরো পরে আবীরের খেয়াল হল, জুনিয়র ক্লাসের একটি মেয়ে মঞ্জুলিকার সাথে একসাথে বাড়ি গেছিল, ওদের বাড়ি এক‌ই পাড়ায়। নিজের ক্লাস বাঙ্ক করেও সে জুনিয়র ক্লাসে ঢুঁ দিল। আর সেই মেয়েটির মুখেই শুনল, মঞ্জুলিকার বাবা হঠাৎ করেই তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। মেয়ের আপত্তি ধোপে টেকেনি। শ্বশুরবাড়ি কলকাতার বালিগঞ্জে। শ্বশুর তাকে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভর্তিও করে দিয়েছে কলকাতার কোন কলেজে। বুকের ভিতরটা হূ হূ করে উঠেছিল সেদিন আবীরের।
সন্ধ্যায় হস্টেলের ঘরে ফিরে আলো নিভিয়ে চুপ করে বসল আবীর। মঞ্জুলিকার একখানা ফটোও নেই তার কাছে। বুকের ভিতর একটা কান্না দলা পাকিয়ে উঠছিল। কাউকে বলবার নেই এই অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা। কত সময় কেটে গেল, খেয়াল করল না সে। রাতে খেতেও গেল না ক্যান্টিনে। অনেক রাতে টেবিলে রাখা ছোট টেপ রেকর্ডারটায় মঞ্জুলিকার জন্য কেনা ক্যাসেটটা ভরে চালিয়ে দিল। ভিতর থেকে ভেসে এল গান…
‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে

বসন্তের বাতাসটুকুর মতো
সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত
সে চলে গেল, বলে গেল না
সে কোথায় গেল, ফিরে এল না
সে যে যেতে যেতে চেয়ে গেল
কি যেন গেয়ে গেল
তাই আপন মনে বসে আছি কুসুমবনেতে
সে ঢেউয়ের মতো ভেসে গেছে
চাঁদের আলোর দেশে গেছে…’

আজ এই মাথা দোলানো কাশবনের দিকে তাকিয়ে সব যেন মূর্ত হয়ে উঠল। মনের গহীনে সেই গানটাই গুনগুন করে উঠল …তাই আপন মনে বসে আছি কাশের বনেতে…সাইডব্যাগটার ভিতর থেকে খাতার একটা সাদা পাতা কেবল সাক্ষী হয়ে র‌ইল এ ইতিহাসের। অস্তগামী সূর্যের শেষ কিরণ কাশের ফুল ছুঁয়ে নদীর জলে এসে পড়েছে। শিবুর দাঁড় টানার ছলাৎছল আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। ফেরবার সময় হয়ে এল। আবীর বাঁ হাত দিয়ে চশমাটা খুলে ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে চোখের কোণে জমে ওঠা শিশির মুছে নেয়। তারপর সাইডব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
✍️(ডাঃ)অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
ছবি:অন্তর্জাল

Leave a Comment