ভালোবাসা কি কেবল শরীর খোঁজে ?

কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সায়ন শুভ্রাকে বললো , ” এই আমরা আজ যাবো তো সন্ধ্যেতে?
শুভ্রা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো , ” কোথায়??”

” কেন, তোকে যে বলেছিলাম আজ আমরা হোটেলে যাবো। আজ বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা এক সাথে থাকবো!!”
শুভ্রা সেই কথা ভুলে গেছে। আসলে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি যে সে যাকে ভালোবেসেছে সে এমন কিছু চাইবে!! সে আগে কোনো দিনও কোনো ছেলেকে বিশ্বাস করতো না। ভাবতো সব ছেলে খারাপ। সবাই শুধু মেয়েদের ভোগ করতে চায়!
আর তার এমন ভাবনাও ভুল না। এই তো কদিন আগে শুভ্রার প্রিয় বান্ধবী সুচিত্রার ওর বয়ফ্রেন্ড এর সাথে ব্রেকআপ হয়েছে। মেয়েটা ওর বয়ফ্রেন্ডকে নিজের সব কিছু উজাড় করে দিয়েও ভালোবাসা পেলো না। শুভ্রা প্রতিদিন কলেজ গেলে, পাড়াতে বা রাস্তায় কতই না এরকম দেখেছে বা শুনেছে।
যেসব মেয়ে নিজেকে উজাড় করে দেয় সেই ভালোবাসার মানুষরূপী হিংস্র পশুদের কাছে তারাই জীবনে ঠকে যায়!! শুভ্রা নিজেও সেটা মানতো। কিন্তু আজ কেন নিজেই সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে তা সে নিজেই জানে না ! ভালোবাসতে সে নিজেই আজ অন্ধ হয়ে গেছে !!
সায়ন আর শুভ্রা সেই ছোটো বেলা থেকে বন্ধু, সুখ দুঃখের সাথী। সায়ন কথা বলতে খুব ভালোবাসে। কিন্তু শুভ্রা একেবারেই শান্ত, নিরীহ একটা মেয়ে। একসাথে পড়তে পড়তে কখন যে তারা ভালোবাসার ঘরে একসাথে থাকতে শুরু করেছে তা তারা জানে না। বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসার সেই সম্পর্কে আজ তারা তিন তিনটি বছর পেরিয়ে এসেছে। এখন কলেজের ফাইনাল সেমিস্টার চলছে তাদের। এই তিনটি বছরে শুভ্রা দেখেছে সায়ন এমন কিছু চায় নি যা সে দিতে পারবে না। আর তাই হয়তো শুভ্রা সায়নকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে। আর সায়ন ও এটাই ভাবে যে শুভ্রা তাকে কোনো কিছুতে না বলে না।

কিন্তু গত পরশু সায়ন শুভ্রাকে কল করে বলে –
” এই তুই আমাকে কতটা ভালবাসিস রে??”
শুভ্রা অবাক হয়ে বলে,” আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন করছিস??”

“আরে বল না কতটা ভালবাসিস?”

“অনেকটাই…সেটা বলে বোঝানো যাবে না। শুধু অনুভব করা যাবে।”

“তাহলে আজ আমি একটা জিনিস চাইবো, দিবি তো??”

“হ্যাঁ নিশ্চই…!”

“কথা দে তাহলে দিবি আমাকে?”

“দিলাম কথা। এবার বল তোর কি চাই??”

আমি দুদিন পর একটা হোটেল বুক করছি। আমার সাথে বিকেল বেলায় যাবি। আমি তোকে সন্ধ্যে বেলায় তোর বাড়িতে পৌঁছে দেব?

” কেন!!! আমি যাবো কেন?”

” আরে এটাও বুঝিস না। বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড হোটেল যায় কি করতে??”
শুভ্রা ভয় পেয়ে গেল। সে বললো,” বিয়ের পর ওসব করলে হয় না??”

” না, হয় না। তুই আসবি কিনা বল??”

“কিন্তু বাড়িতে কি বলবো?”

“বলবি টিউশন যাচ্ছিস আমার সাথে। আমাকে তো তোদের বাড়ির সবাই চেনে।”
শুভ্রার ইচ্ছে না থাকলেও সে বললো, ” আচ্ছা, ঠিক আছে।”
ফোনটা রেখে দেবার পর শুভ্রা ভাবছে আজ সে অনেক বড়ো অন্যায় করে ফেলেছে। সে কোনো দিনও সায়নকে কোনো কিছুতে না করে নি তাই আজ তাকে এই দিনটা দেখতে হচ্ছে। সে কাঁদতে কাঁদতে এসব ভাবছে। দুদিন হল সে ঠিক মত খায় নি, ঘুমোয় নি। আর সায়নকে বুঝতেও দেয় নি তার অন্তরের কষ্টটা!!
শুভ্রা এটাই ভাবছে, ভালোবাসা মানে কি শুধুমাত্র শারীরিক চাওয়া পাওয়া?? এখানে কি মনের কোন জায়গা নেই? ভালোবাসা কি সত্যিই এতটা সস্তা!!যে সায়নকে সে চিনতো, যে সায়ন কে সে ভালবেসেছিল, আজ সেই ভালো দিকটা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল!! সময়ের সাথে সাথে কি মানুষ সত্যিই রং বদলায়,সত্যিই কি পাল্টে যায়?? সত্যিই কি ভালোবাসার ধরনের পরিবর্তন হয়? প্রতিটি ভালোবাসায় কি ধর্ষণ হতে শেখায়!! সায়নকে শুভ্রা কোনদিনও কোন কিছুতে না বলতে পারেনি। তার ফল কি তাকে এভাবেই দিতে হবে, নিজেকে শেষ করে দিয়ে??

এই দুটো দিন শুভ্রা যে কিভাবে কাটিয়েছে তা কেবল সেই জানে! সেদিন বিকেলবেলা শুভ্রাকে নিয়ে সায়ন একটি মস্ত বড়ো হোটেলের সামনে উপস্থিত। শুভ্রা আজ ভেবেই এসেছে সায়নকে সে নিষেধ করবে। যেটা সে কোনদিনও করেনি সেটা আজ তাকে করতেই হবে।
সায়ন শুভ্রাকে বললো,” কিরে চল, ভেতরে চল।”
-“না, রে এটা অন্যায়! এটা ঠিক নয়! ভালোবাসা কি শুধুমাত্র শারীরিক চাওয়া পাওয়া! আমি তোকে সত্যিই ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু এভাবে কি ভালবাসার প্রমাণ দিতে হবে?? আমি পারবো না রে; আমি পারবো না। তার থেকে বরং তুই আমাকে মেরে ফেল তাও ভাল কিন্তু আমি এভাবে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দিতে পারব না!!

সায়ন বললো,” তুই আমাকে বিশ্বাস করিস তো?”
-” হ্যাঁ করি কিন্তু আজ সেই বিশ্বাস সস্তা হয়ে গেছে। ভালবাসাটাকে তুই এমন একটা নোংরা জায়গায় এসে দাঁড় করিয়েছিস যে আমার পক্ষে সে কাজ করা সম্ভব নয়।
সায়ন শুভ্রার কাঁধে হাত রেখে বলল,” ভেতরে চল, ওখানেই কথা হবে।
-” না, আমি তোর সাথে যাবো না। আমি এরকম একটা নোংরা কাজ কখনোই করতে পারবোনা।”
-” আচ্ছা, ঠিক আছে তোকে রুমে যেতে হবে না। তুই আমার সাথে হোটেলের ভেতর পর্যন্ত শুধু চল।”
-“ওইটুকু গিয়ে আর কি হবে?”
-” তোকে যেতে বলেছি তো; তুই একবার চল না..।” শুভ্রার মন না চাইলেও সে সায়নের হাত ধরে হোটেলের ভেতর ঢুকলো।
একি সমস্ত চেনা মুখ এখানে….!!!
সকলে মিলে বলল,” হ্যাপি বার্থডে শুভ্রা!! শুভ্রা ভুলেই গেছে যে আজ তার জন্মদিন! এত খারাপের মধ্যে কি আর নিজের জন্মদিন মনে থাকে। হোটেলের ভেতরেই রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট।সেখানে সবাই জড়ো হয়েছে। বাবা,মা,কাকু,কাকিমা। সঙ্গে সায়নের মা,বাবা এবং অনেক বন্ধু!! সবাই এখানে উপস্থিত।
শুভ্রা তার মাকে বললো,” মা তুমি সব জানতে? কই আমাকে তো কিছু বলোনি?” শুভ্রার মা বললেন,” হ্যাঁ সায়ন বলতে বারণ করেছিল তোকে সারপ্রাইজ দেবে বলে!
শুভ্রার চোখে তখন জল… সে সায়নকে জড়িয়ে ধরে বলল,” তুই এতটা খারাপ! আমাকে এরকম ভাবে তুই কষ্ট দিতে পারলি।”
সায়ন হাসতে হাসতে বলল,” কি করব বল। তুই তো আমার সব কথাতেই হ্যাঁ বলিস। কোনদিনও না বলিস না আর ঝগড়াও করিস না। তোর সাথে ঝগড়া করতে একটু ইচ্ছে হলো তাই….!

” তা বলে তুই আমার সাথে এরকম করবি? তুই জানিস আমি দুদিন ঠিকমতো করে খাইনি,ঘুমোইনি।”

“হ্যাঁ, আমি সবই জানি; কাকিমা আমাকে সবই বলেছে এবং কাকিমাকে বলেছিলাম যে আপনারা ওকে কিছু বলবেন না।”
সায়নের বুকে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে শুভ্রা বললো,” তুই খুব খারাপ !! তুই খুব পাজি!” যা আমি তোর সাথে কথা বলব না।
সায়ন হাসতে হাসতে বলল,” অপারেশন সাকসেসফুল!! আজ তোর আর আমার মধ্যে এই প্রথম ঝগড়া হতে চলেছে।”

শুভ্রা সায়নকে কয়েকটা কিল-ঘুষি মারতে থাকলো।আর সায়ন মূর্তির মত শুভ্র সামনে দাঁড়িয়ে রইলো; তার কোনো প্রতিরোধ করলো না। শুভ্রা সায়ন এভাবে মারতে মারতে একসময় হাঁপিয়ে উঠলো এবং তার কাঁধের ওপরে থাকা ওড়নার একপাশটা নিচে পড়ে গেল! সায়ন সেটা নিজে হাতে শুভ্রার কাঁধে তুলে দিতে দিতে বলল,” পৃথিবীর সব ছেলে সমান নয়, বুঝলি!!সব ছেলে শরীর খোঁজে না; কিছু কিছু ভালোবাসা মনের দিক থেকেও হয়ে থাকে। সব ছেলে ওড়নার ওপরে ভেসে ওঠা স্তন খোঁজেনা!! কিছু কিছু ছেলে থাকে, যারা বুকের মধ্যে থাকা ওই মনটাই খোঁজে। ভালোবাসাটা শরীরে নয় ভালোবাসাটা মনে। ভালোবাসাটা শরীরী নয়, সেটা মানসিক….!
শুভ্রা বললো,” তুই সত্যিই খুব খারাপ একটা ছেলে।”

” আচ্ছা আমি খারাপ, এখন চলুন কেক কেটে আমাদের ধন্য করুন।”😊😊
_____সমাপ্ত____

Leave a Comment