গল্প:-ক্ষমা।


আজ মনটা বড়ই অশান্ত রিনির। কিছুতেই ঘুম আসছে না। স্বামী সুবীর ব্যাবসার কাজে আজ ২ দিন হলো কলকাতা গিয়েছে। কাল ফিরবে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকে সে।
রাত তখন প্রায় ২ টো। একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো রিনির। সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে দেখলো, এক অতীব সুন্দরী দেবী-মূর্তি তার পাশে এসে বসলেন। তাঁর পরনে অত্যন্ত দামী লালপেড়ে সাদা শাড়ি। গোটা গায়ে গহনাতে ভর্তি।পায়ে নূপুর।
দেবীমূর্তি রিনির উদ্যেশে বলে উঠলেন,
“কি রে ঘুম আসছে না? কষ্ট হচ্ছে???
রিনি উত্তরে বলে,
“মা! তুমি এসেছ?? জানতাম তুমি আসবে!!!
“ওরে তুই যে ব্যাকুল হয়ে আমাকে ডাকিস! আমি না এসে থাকতে পারি কি?”
দেবীমূর্তি হেঁসে জবাব দেন।।।
“মা!আমার বড়ই কষ্ট! তাকে হারানোর কষ্ট আমাকে কুরেকুরে শেষ করে দিচ্ছে!!! আর যে পারছি না মা!!! আমায় রক্ষা করো তুমি!!!
কথা বলতে বলতে কান্নায় ফেটে পড়ে রিনি।
এবার দেবীমূর্তি রিনির পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকেন,
“ওরে তাকে তো পাবিই সঙ্গে তার রক্ষাকর্তা কে ও পাবি!!! চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে!!! আমি আছি না!!!!
রিনি ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠে,
“মা! তুমি আসবে না? তুমি আসলে ভালো হতো!!!
উত্তরে সেই দেবীমূর্তি মমতা জড়ানো গলায় বলে ওঠেন,
“আসতেই পারি!!! তুই আমাকে এতো ভালোবাসিস, তোর কাছে না এসে আমি থাকবো কিভাবে??? এবার আমার যাবার সময় হয়েছে। এবার আসি রে মা!! ভালো থাকিস!!!

তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় রিনি ধীরেধীরে মিলিয়ে যাওয়া নূপুরে রিনিঝিনি শব্দ শুনতে পায়। উত্তর কলকাতার বনেদী চৌধুরী বাড়িতে আজ চরম ব্যাস্ততা। কলকাতার নামকরা প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার অনিল চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে রিনিকে দেখতে আজ পাত্রপক্ষ আসছে। কথিত আছে এই চৌধুরী পরিবার একসময় বণিক চাঁদ সওদাগরের স্নেহধন্য ছিলেন। তাই এনাদেরও আরাধ্যা দেবী মা মনসা।।।
“আটটা বেজে গেলো, এখনো মেয়েটা ঘুম থেকে উঠলো না???
চোধুরী গিন্নির চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ সুস্পষ্ট।
সত্যি তাই যে মেয়ে ভোর বেলা উঠে স্নান করে দেবী আরতি দিয়ে দিন শুরু করে, যার সুমধুর কন্ঠে দেবী মনসার গুণকীর্তন গান শুনে বাকি লোকের ঘুম ভাঙে, তার এই বেলা ৮ টা পর্যন্ত ঘুমানো বড়ই অপ্রত্যাশিত যে…..
“রিনি! মা উঠে পর! আর ঘুমাস না! পাত্রপক্ষ এসে পড়লো যে..
জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিয়ে চৌধুরী গিন্নি রিনিকে ডাকতে থাকেন।।।।
তখনো চৌধুরী পরিবার বুঝতে পারেন নি কি অঘটন ঘটে গেছে….
দরজা ভেঙে যখন সবাই ঘরে ঢোকে তখন রিনি ওদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।
বিছানায় রাখা একটা চিঠি তুলে নেন অনিল চৌধুরী।
জোরে জোরে পড়তে শুরু করেন তিনি,
“আমাকে ক্ষমা করো বাবা, মা!!! আমি তোমাদের কোনোদিন বলতে পারিনি!!! আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি। নিচু-বর্ণের ছেলে ও। জানতাম তোমরা ওকে মেনে নেবে না।ওর সাথেই ঘর ছাড়ছি। খোঁজার চেষ্টা করো না! তোমরা ভালো থেকো!! আর একটা কথা, “মা” কে আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি!!!!”
এক ছুটে চৌধুরী দম্পতি ঠাকুর ঘরে ঢোকেন। সবিস্ময়ে তারা দেখেন তাদের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত পিতলের মনসা মূর্তিটি গায়েব!!!
ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন অনিল চৌধুরী।
মাথা নিচু করে গম্ভীর গলায় তিনি বলে ওঠেন,

“গিন্নি আজ থেকে ভেবো আমাদের মেয়ে মারা গেছে।” নূপুরের আওয়াজটা মিলিয়ে যেতেই রিনির তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যায়। সত্যি কি সে, মা কে দেখেছে???
বিছানা ছেড়ে উঠে পরে সে।
জানলার পাশে দাঁড়ায়। পূর্ণিমার পূর্ন চন্দ্র তখন মাঝ আকাশ পেরিয়ে গিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে রিনি পুরোনো স্মৃতির অতল গহ্বরে ডুবে যায়।
সুবীরের সাথে এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিল সে। কলকাতা থেকে অনেকদূরে বাঁকুড়াতে ছোট্ট একটি মাটির বাড়িতে স্বপ্নের ঘর বাঁধে রিনি। সুবীরের আয় ছিল খুবই সামান্য। সুবীর আর সুবীরের জামাইবাবুর জয়েন্ট একটা ছোট মাছের আড়ৎ ছিল বাঁকুড়াতে। শ্বশুর, শাশুড়ি,দেওর, জা নিয়ে ৬ জনের ভরাট সংসার রিনির। এতবড় সংসার একমাত্র সুবীরের আয়ের উপর নির্ভর। যে আয়ে দুবেলার ক্ষুন্নিবৃত্তি কোনোমতে নিবারণ হয়।
হায় রে বিধাতা! যে রিনি, চৌধুরী বাড়িতে রাজরানী হয়ে থাকতো, আজ সে সামান্য অন্নের কাঙালী।।।
তবে শত অভাবের মধ্যেও সুবীর আর রিনির ভালোবাসা একফোঁটাও কমে নি।
কে বলে “অভাব যখন দরজায় কড়া নাড়ে তখন ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালায়”???
আসলে যারা ভালোবাসার মর্ম বোঝে না তারাই কেবল এই কথা বলে।
ভালোবাসতে “ভালোবাসা” লাগে ভালো “বাসা”(ঘর) নয়।

এরমধ্যে আবার সুবীরের জামাইবাবুর সাথে সুবীরের মাছের আড়ৎ এর অংশীদারিত্ব নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়েছে। জামাইবাবুর ইচ্ছা সুবীর মাছের আড়ৎ ওর জামাইবাবুর নামে লিখে দিক।।।
শত অভাব, শত কষ্ট উপেক্ষা করে এগিয়ে চলছিল রিনিদের জীবন। এরমধ্যে রিনির কোল জুড়ে ফুটফুটে একটি পুত্রসন্তান আসে। খুবই মিষ্টি ছেলেটা। বাড়ির সবাই ভালোবেসে তাকে রকি নামে ডাকত। রিনি রকিকে বুকে আগলে রেখে বড় করতে থাকে।।।।
রকির যখন ২ বছর বয়স,তখন সুবীরের দিদি জামাইবাবু আর ভাগ্নে তাদের বাড়িতে আসে। তখন আড়ৎ নিয়ে ঝগড়া সীমা ছাড়িয়েছে। আজকে ওরা এসেছে রিনির শ্বশুরের সাথে বোঝাপড়া করতে।
না,বৃদ্ধ রাজি হন না, নিজেরদের আয়ের শেষ সম্বলটুকু হারাতে।
নিজের জামাইকে তা জানাতেই সে রাগে গজগজ করতে করতে বেড়িয়ে যায়। যাওয়ার সময় “দেখে নেওয়ার” হুমকিও দিয়ে যায়।
রিনির ননদ আর ভাগ্নে রয়ে যায়।।।
সেদিন দুপুরে রিনি রান্নার কাজে ব্যাস্ত ছিল। রকি রিনার ননদের ছেলের সাথে খেলছিল। এমনসময় রিনির ননদ রিনিকে এসে বলে,
“বৌদি তুমি রান্না করো! আমি বরং বাচ্চাদুটোকে পুকুর থেকে স্নান করিয়ে আনি।”
রিনি খুশিই হয়। বলে,
“তাহলে খুব ভালোই হয় দিদি!!! তুমি আমাকে বাঁচালে!!!”
মানুষের কুটিল মনের হদিশ পাওয়া যে বড়ই দুরূহ।
যদি সেদিন রিনি সরল মনে নিজের ছেলেকে ননদের হাতে ছেড়ে না দিতো তাহলে আজ রকি বেঁচে থাকতো।
“ও বৌদি ছুটে এসো! রকি জলে পড়ে ডুবে গেছে! ছুটে এসো গো!!!
ননদের চিৎকারে ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসে রিনি।।।
একছুটে পুকুরপাড়ে পৌঁছায় সে।
ততক্ষনে বাড়ির সবাই পুকুরপাড়ে পৌঁছে গেছে।।।
গ্রামের লোকজন পুকুরে ডুব দিয়ে রকিকে খুঁজতে শুরু করেছে।।।
কিছুক্ষন পরে একজন মৃত রকিকে জল থেকে তুলে আনে।।
যেখানে রকির মৃতদেহ মেলে সেখানে তার পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। ওইটুকু বাচ্চা অত উঁচু পুকুরের পাড়ে উঠে তারপর জলে পড়ে যাবে, এ যে অবিশ্বাস্য।।।
কারোর আর বুঝতে বাকি থাকে না….
গোটা গ্রাম হতচকিত, হতভম্ব।। ওইটুকু দুধের শিশুর কি অপরাধ ছিল, যে তাকে পারিবারিক হিংসার বলি হতে হলো????

এদিকে রিনি নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আজ আশ্চর্য রকম শান্ত। চোখে একফোঁটা জলের চিহ্ন নেই।তার চোখের জল যেন মানুষের প্রতিহিংসার কাছে হেরে গেছে। মানুষের প্রতি ঘৃণায় সে বাকরোহিত।।।
ওদিকে রিনির শ্বশুর-শাশুড়ি প্রথম নাতির শোকে তখনও বিলাপ বকে চলেছে।
সুবীর থানায় যাচ্ছিল!!
এই প্রথম রিনি মুখ খুললো।
“না! তুমি কোথাও যাবে না! আমি তো আর আমার সন্তানকে ফিরে পাবো না! কি হবে থানায় গিয়ে?পারলে ওদের ক্ষমা করে দাও!”
এরপর ননদের দিকে ফেরে রিনি,বলে,
“দিদি পারলে তুমি এমন করতে? তোমার না একটা সন্তান আছে? একবারও তোমার হাত কাঁপলো না?? ছিঃ দিদি ছিঃ!!!
আর দাঁড়ায় না রিনি! সোজা ঘরে চলে এসে ঠাকুরঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।।।
ভোরের আজানের শব্দে রিনির সম্বিৎ ফেরে। অনুভব করে অজস্র অশ্রুধারা তার গাল বেয়ে নীচে বয়ে চলেছে।।।।
না! আর ঘুম হবে না!!!
রিনি তাড়াতাড়ি বাইরে চলে আসে। স্নান করে তৈরি হয়ে ঠাকুর ঢোকে।।। আজ মা-বেটির অনেক বোঝাপড়া আছে যে…….

আজ রিনির গলায় মা মনসার গান বড়ই স্বর্গীয় শোনাচ্ছে। রিনির শাশুড়ি, ননদ আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না। সবাই এসে ঠাকুরঘরের সামনে দাঁড়ায়।।।
প্রসন্নচিত্তে পুজো শেষ করে বাইরে আসে রিনি।
রিনির শাশুড়ি, রিনির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“মা! কাল রাতে তোমার ঘরে কি কেউ এসেছিল? আমি রাতে নূপুরের শব্দ পেয়েছি।
রিনির জা বলে ওঠে,
“হাঁ দিদি! আমিও শুনেছি! কেউ একজন যেন নূপুর পড়ে তোমার ঘর থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত এলো। তখন খুব সুন্দর একটা সুগন্ধ বেরোচ্ছিলো। তুমি কি কাউকে দেখেছো???”
উত্তরে রিনি কেবল মাথা নাড়িয়ে না জানার ভান করে।
১ মাস পরে….
বাড়িতে এখন খুশির সু-বাতাস। রিনি আজ পুজো করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো।ডাক্তার এসেছিলেন ! সব দেখে তিনি সুবীরের দিকে হেঁসে বলেন,
“সুবীর মিষ্টি আনাও! তোমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা! খুব সাবধানে রেখো ওকে! কয়েকটি ওষুধ লিখে দিচ্ছি আমি সেগুলো ওকে নিয়মিত দিয়ো! আর ১৫ দিন পরে একটা USG করে আমার চেম্বারে দেখা করো!!!!
রিনি আজ হসপিটালে ভর্তি! ওর যমজ সন্তান হয়েছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। বাড়ির সবাই খুব খুশি। রিনিও পরম তৃপ্ত আজ।
মা! কথা রেখেছেন যে!!!
সময় নদীর স্রোতের মতো এগিয়ে চলে!
রিনির ছেলে মেয়ে পুলক, আর পৃথা পরম মমতায় বড় হতে থাকে।

মনসা মায়ের কৃপায় আজ সবকিছু পেয়েছে রিনি।
সুবীর স্কুল মাষ্টারী পেয়েছে গত SSC তে। রিনির নিজে একটি টেলারিং এর দোকান খুলেছে! সেটাও ভগবানের কৃপায় বেশ ভালোই চলছে। সুবীরের ভাই আজ প্রতিষ্ঠিত।
ডুবে যাওয়া সংসারটা আজ কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতাবলে যেন আবারও জেগে উঠেছে।
তবে রিনির ছেলে পুলক যেন তার প্রথম সন্তান রকি। সেই একই চোখ একই মুখ। সেই একই রকম আধোআধো কথা বলার ধরণ। একই বসার স্টাইল। বারবার পুলককে রকি ভেবে ভুল করে বাড়ির লোক।এতো মিল কারোর মধ্যে থাকতে পারে???
আর পৃথা যেন দেবী। তার অপরূপ রূপের ছটায় গোটা বাড়ি যেন ঝলমল করে। তবে ওর রাগটা বড়ই ভয়ানক।।
দুই ভাইবোন যেন হরিহর আত্মা।। কেউ কাউকে ছেড়ে একমুহূর্ত থাকতে পারে না। বিশেষ করে পৃথা!! সে পুলক কে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করে না। দেখলে মনে হয়, পৃথা যেন পুলককে পৃথিবীর যা খারাপ, যা অশুভ তার থেকে আলাদা করে রাখে!!!
এছাড়া মেয়েটি একটি বিশেষ গুন আছে,এই সেদিন পাশের বাড়ির ভোম্বল পুলককে উত্যক্ত করছিল। পাশে দাঁড়িয়েছিল পৃথা। রেগে সে ভোম্বলের গায়ে আঁচড় দেয়। কিছুক্ষনের মধ্যে ভোম্বলের গোটা গায়ে ইনফেকশন ছড়িয়ে যায়। বেচারা ১ সপ্তাহ হসপিটালে ভর্তি থেকে তবে সুস্থ হয়। তাছাড়া মেয়েটির লালায় কি যেন আছে।। সেবারে রিনির ঠোঁট কেটে গিয়েছিলো।পৃথা পরম মমতায় মায়ের ঠোঁটে নিজের থুতু লাগিয়ে দেয়,কিছুক্ষনের মধ্যে রিনির গোটা ঠোঁট ফুলে যায়। ভয়ানক ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে…..
আজ পুলক আর পৃথার ২ বছর বয়স। বাড়ির সবাই এখন রিনির ননদ, জামাইবাবু কে মাফ করে দিয়েছে। রিনির শশুরের ইচ্ছা মাছের আড়ৎ এবার ওদের নামে লিখে দেওয়ার। সেইজন্য আজ ওরা বাড়িতে এসেছে।।।

সোফায় বসে চা খেতেখেতে রিনির ননদ,জামাইবাবু ওদের সাথে গল্প করছিল।
হঠাৎ রিনি লক্ষ্য করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পুলক ওর পিসির দিকে তাকিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। আর পৃথা ভয়ানক ত্রুর দৃষ্টিতে পিসির দিকে তাকিয়ে।
ভয়ে আঁতকে ওঠে রিনি, ছেলে মেয়েকে নিয়ে সে নিজের ঘরে চলে আসে।
পুলক নিজের মাকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। কান্না জড়ানো গলায় সে বলে ওঠে,
“মা! ওই পিসি খুব বাজে! আমাকে উনি গলাটিপে মেরে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। আমি ওর সামনে কোনোদিন যাবো না মা!!!”
এদিকে পৃথা তখনও রাগে ফুঁসছে।।। পৃথার সেই ভয়ানক ত্রুররূপ রিনির হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।।।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় রিনি। তাহলে কি মা মনসা কথা রেখেছেন? রকিকে সে ফেরত পেয়েছে। পুলক যে রকির পুনজন্ম সেটা বুঝতে আর বাকি থাকে না। তাহলে দেবীর কথামত দেবীর নিজের আসার কথা! তবে কি পৃথা???…
মাথা নিচু করে হাত জড়ো করে রিনি পৃথার সামনে দাঁড়ায়! বলে,
“মা! ঠান্ডা হ! আমি মা হয়ে তোর কাছে হাতজোড় করছি,তুই ঠান্ডা হ!!!”
ক্ষনিকের বিরতি..
আবারও মেয়েটি সেই সদাহাস্য চঞ্চলা মেয়েতে পরিণত হয়েছে।
আবারও সে ভাইয়ের সাথে খেলতে শুরু করেছে।দেখলে মনে হবে যেন কিছুক্ষন আগে কিছুই হয় নি।।
১০ বছর পরে….

এখন রিনির ভরাট সংসার।। মা মনসার আশীর্বাদে ভালই পয়সাকড়ি হয়েছে। ছেলে মেয়ে দুটো আজ দেখতে দেখতে ১২ বছর বয়স হলো।।।
মানুষের হিংসা বড়ই অদ্ভুত যে। যার মনে একবার কুটিল পাপ ঢুকে গেছে তাকে ধর্মের পথে নিয়ে আসা যে অসম্ভব।।।
আজ ননদ আর ননদের ছেলে এসেছে। রিনি নিজে রান্না করছিল। ৩ গ্লাস দুধ গরম করে রিনি নিজের দুই সন্তান আর ননদের ছেলেকে দিতে দিতে যাচ্ছিল। রিনির ননদ ওকে দাঁড় করায়।
“বৌদি দুধটা দাও! আমি দিয়ে আসি! তুমি বরং রান্না করো!!!
এরপর সে দুধের গ্লাসে বিষ মেশায়। এক গ্লাস পৃথাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। আরেকটি গ্লাস পৃথার হাতে দিয়ে বলে,

“যা এটা পুলককে দিয়ে আয়”……
অনেকক্ষণ বাড়িতে সবাই চুপচাপ দেখে রিনি রান্নাঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে।
দেখে পৃথা বারান্দায় বসে, তার চোখ রাগে টকটকে লাল। মাথার খোলা এলোমেলো চুল ভয়ানকভাবে উড়ছে।।। গলা থেকে ভয়ানক রাগের ত্রুর শব্দ ভেসে আসছে।।। সামনে বাড়ির পোষা বিড়ালটা মরে পড়ে আছে। তার সামনে একটা বাটিতে দুধ রাখা।।। আর বুঝতে অসুবিধা হয় না রিনির।।
নিজের ননদকে খোঁজা বোকামি। রিনি জানতো সে বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
রিনি রাগে ঘৃণায় কেঁদে ফেলে…
“আমি কাউকে ছাড়বো না! কাউকে ছাড়বো না!!
পৃথার গলা শুনে ভয়ানক চমকে ওঠে রিনি। এ কার গলা??? এটা কোনো ১২ বছর বয়সী মেয়ের গলা মানতে ভয় হয়!!
কে উনি? পৃথা না পৃথার রূপে অন্য কেউ…
পৃথা উঠে বাইরে চলে যাচ্ছিল।।
রিনি ওকে দাঁড় করায়,
“দাঁড়া পৃথা! শোন আমি “ক্ষমার” আদর্শে বিশ্বাসী। আমার ধর্ম, আমার সমাজ, আমার সংস্কৃতি আমাকে মানুষকে ক্ষমা করতে শিখিয়েছে। তুই ওদের কোনো ক্ষতি করবি না!!!”
কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে নিজের মেয়ের কাছে বিনতি করে রিনি।।।
তখন পৃথা রাগে গজড়াচ্ছিলো, সে সেই ত্রুর স্বরে বলে ওঠে,
“তাহলে মা ওরা সারাজীবন অন্যায় করে যাবে আর তার শাস্তি হবে না???
এবার গর্জন করে ওঠে রিনি,
“কে শাস্তি দেবে? তুই দিবি? তুই কি ভগবান নাকি তুই শাস্তি দিবি?? আর ওরা যে অন্যায় করেছে, সেই অন্যায় আমরাও করলে, ওদের আর আমাদের মধ্যে ফারাক কি রইলো। আমি প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী নই। মাথার উপর একজন আছেন তিনি যা বিচার করবেন সেটাই শিরোধার্য।।।”
“তিনি যা বিচার করবেন সেটা তুমি মেনে নেবে তো মা!!!
পৃথা মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে।।।
এখন সে আগের শান্ত মেয়ে।
রিনি পৃথার মাথায় হাত রেখে চুপ করে থাকে।।।
১ মাস পরে,

রিনি সকালে চেয়ারে বসে খবরের কাগজে একটা খবর খুব মন দিয়ে পড়ছিল।
“বাঁকুড়া সড়ক দুর্ঘটনাতে এক দম্পতি মৃত। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে তাদের একমাত্র সন্তান এই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায়। তার চোট খুবই সামান্য।।”
পাশেই পৃথা দাঁড়িয়ে ছিল, মায়ের উদ্যেশে সে হেঁসে বললো,
“কি মা! এবার খুশি তো? বিধাতার বিচার কেমন হলো??”
হাঁ বা না কিছুই বলে না রিনি। শুধু চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে বলে ওঠে,
“তোর বাবাকে বল, তোর পিসির ছেলেকে এখানে নিয়ে আসতে। ও এখানেই মানুষ হবে। হায় রে বেচারা বাপ মা হারা ছেলেটা যাবে বা কোথায়????

Leave a Comment