এক থা রাজা এক থি রানী

আয়নার সামনে তৈরি হতে হতে, রীতি ভাবে কি জানি শৌনক আজ ও বলে উঠতে পারবে কিনা। কতো বছর হয়ে গেল ওদের বন্ধুত্বের,এখনো ওরা দুজন,দুজন কে” ভালবাসি” এই কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারে নি।শৌনক আজ ওকে বারবার করে ওদের পছন্দের কফি শপে ডেকেছে,ওর কাকে মনে ধরেছে সেই অনুভূতি শেয়ার করবে বলে।সে যে কে তা রীতি ভালো মতোই জানে, তবু কিছু না বোঝার ভান করে,”আচ্ছা যাবো”বলেছে।

কফি শপে যেতেই দেখে শৌনক আগেই পৌঁছে গেছে। ওকে দেখে দু কাপ কফির অর্ডার করে। রীতি বসে বলে,”তাকে ও আস্তে বলতে পারতি,আজ দেখাটাও হয়ে যেত।”শৌনক ওকে থামিয়ে বলে,”আরে তোকে তাহলে গল্প বলাটা হতো না।আজ গল্প টা শোন, তারপর রোজই দেখতে পাবি,পাক্কা প্রমিস।”রীতি একটা অদ্ভুত এক্সপ্রেশন দিয়ে বলে,”নে বল তবে,শুনি আর কি।”
“একদেশে এক রাজা আর রানী ছিল।”শৌনক কে থামিয়ে , রীতি বলে ওঠে,”দেখ শৌনক ভালো হবে না বলে দিচ্ছি,তুই আমায় ফোন করে এখানে ডাকলি তোর কার প্রতি নাকি অন্য রকম ফিলিংস হচ্ছে সেই গল্প বলবি বলে।আর এখন এসব ভাটের গল্প দিচ্ছিস।” এই বলে কফি শপের চেয়ার ছেড়ে উঠে রীতি, রীতিমতো বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে গেলে শৌনক ওর হাতটা ধরে বলে,”প্লিজ বস,আমি সত্যি বলবো,আমায় বলতে দে।”
রীতি মনে মনে ভাবে,”অনেক হয়েছে চাঁদ , তোমায় বলতেই হবে নিজের মুখে, নাহলে আমি ও কোনো দিন বুঝবো না।আজ আট বছরের

ওপরে আমাদের বন্ধুত্ব,আর এটা যে শুধু বন্ধুত্ব নয় , দুজনেই ভালো মতো জানি, তাহলে স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায়?”মুখে ছদ্ম গাম্ভীর্য এনে বলে,”ঠিক আছে এতো করে যখন বলছিস , বসছি। এবার বলে ফেল।”শৌনক একটু গলা খাকারি দিয়ে বলে,”হ্যাঁ শোন,তো কি হয়েছে রাজা রোজ সকালে বাড়ির সামনের মাঠে ফুটবল খেলত।আর রানি ওই মাঠের পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পড়তে যেত।আর রাজা তখন খেলা থামিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। মনে মনে ভাবতো কোনো মেয়ে এতোটা সুন্দর, এতো টা স্নিগ্ধ হয়। একদিন কোচ ব্যাপার টা দেখে ,মাথায় চাটি মেরে বলে,নে মাঠ পাড় করে চলে গেছে, এবার খেলায় মন দে।”
রানি ঘন্টা দেড়েক পর আবার ওই রাস্তা দিয়ে ফিরত।রাজা কোনো না কোনো অছিলায় মাঠে থেকে যেত ,রানির বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত। একদিন প্রাকটিক্যাল ক্লাসের কাজ করতে হবে বলে,রাজা বাড়ি ফিরে আসে ,মনে মনে ভাবে আজ আর তার বাড়ি ফেরা দেখা হলো না।বাড়ি ফিরে কলিং বেল টিপতে ,একটু পরে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো রানি।ভ্যাবলার মত সেদিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে থাকে রাজা।কেউ ঘরে ঢুকছে না দেখে,রাজার মা বাইরে বেরিয়ে এসে বলে,অমন ভাবে তাকিয়ে থাকিস না,বড্ড বোকা বোকা লাগছে। ও তোর বাবার কাছে ইংলিশ পড়তে আসে।আমি রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকায়,তোর বাবা ওকে বলে দরজাটা খুলে দিতে।
তখন রাজার সেকি অবস্থা!হাসবে,না কাঁদবে ভেবেই উঠতে পারে না। কোনো রকমে নিজের ঘরে গিয়ে আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে নেয় খুব বাজে লাগছে কি! তারপর দু একদিন পরে বাড়িতে বলে,বুঝলে পড়ার খুব চাপ,রাত জেগে পড়তে হচ্ছে কাল থেকে আর মাঠে যাবো না।রাজার মা কিন্তু সব বুঝতে পারে,ওর কথা শুনে মুচকি হেসে বলে, “হয়ে গেল!”

এরপর কারনে-অকারনে বাবার কাছে ইংলিশ বুঝতে যাওয়া।কারণ ওর হঠাৎ মনে হয় ফিজিক্স ,কেমিস্ট্রির থেকে ও ইংলিশ টা অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং। কিন্তু কদিন পর রানির পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। ততদিনে দুজনের একটু বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।বাবার অনুপস্থিতিতে আর সব ছাত্র ছাত্রীদের সাথে কথা বলার সময় ওদের মধ্যে ও কথা হয়। এভাবেই রাস্তায় দেখা হলে দাঁড়িয়ে একটু আধটু কথা হয়েই যায়। একদিন রাজা বলে রানি কে ,”তোকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবো, অ্যাকসেপ্ট করিস।”
মেসেঞ্জারে কথা,মিম শেয়ার এভাবে কখন যেন ভালো লাগাটা ভালোবাসা হয়ে গেল রাজা বা রানি কেউ বুঝতে পারে না। রীতি ওকে থামিয়ে বলে,”বাই দ্য ওয়ে , তুই কি করে জানলি রানিও ভালোবেসে ফেলেছে?”শৌনক হেসে বলে,”ওমা!না হলে বল তুই এতো অধীর আগ্রহে কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে,তাও গল্প শুনে যাস। তুই তো অপেক্ষায় ছিলি কখন আমি এই পর্যন্ত আসবো,আর তুই আমায় চেপে ধরবি। আমি আর তুই দুজনেই জানি আমরা একে অপরকে কতোটা পছন্দ করি।আর একটা কথা কি জানিস আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে মা আমাকে রোজ নিয়ম করে দুবেলা জিজ্ঞেস করে তোকে বলেছি কিনা। সেদিন তো রেগে গিয়ে বললো,আগে ভাবতাম তোর বাবা কোনো কাজের না, কিন্তু তোর থেকে এটলিস্ট কাজের ,আমায় দেখার এক মাসের মধ্যে প্রপোজ করে ছিলো।”

এই কথা শুনে রীতি হেসে উঠলে,শৌনক বলে,”আয় না আমাদের বাড়িতে আমি অফিস থেকে ফিরবো,তুই সেদিনের মতোই দরজা খুলে দিবি।” রীতি ওর চুল টা ঘেটে দিয়ে বলে,”আগে আই লাভ ইউ বল, তারপর ভেবে দেখব।”শৌনক,”ও আচ্ছা রীতি কে নীতি মেনে প্রপোজ করতে হবে?ওকে বেবি,”এই বলে কফি শপের ফুলদানিতে রাখা একটা গোলাপ নিয়ে ওকে বলে “আমি তোকে … ধুর!কি ভীষন বোকা বোকা শোনাবে,তুই তো সব জানিস।”রীতি হেসে বলে,”জানি, কিন্তু মানি না,ওটা তোকেই মানাতে হবে।”
এটা শুনে শৌনক বলে,”আমার মা তোকে খুব ভালোবাসে।”রীতি বলে,”আর?”শৌনক বলে,”বাবাও খুব ভালোবাসে।”রীতি ওর দিকে তাকিয়ে বলে,”আর?”শৌনক ,”আর কি! আমি ও তোকে খুব ভালোবাসি।”এই বলে রীতির দিকে তাকাতে ও লজ্জায় মাথা নামিয়ে নেয়।শৌনক ওর লজ্জাবনত মুখের দিকে তাকিয়ে, আবারো ওর প্রেমে পরে যায়।।

Leave a Comment