অনুগল্প :কর্মব্যস্ততা

আজ অনেকগুলো বছর পর আবার রিতেশের সাথে প্রিয়াসার দেখা। এইভাবে এতদিন পর অপ্রত্যাশিতভাবে আচমকা দেখা হয়ে যেতে উভয়ের বুকটাই কেঁপে ওঠে। আবার কখনো দুজনের দেখা হয়ে যেতে পারে এটা কখনোই পিয়াসা আশা করেনি । তাইতো সে রিতেশের সাথে ডিভোর্স হওয়ার কিছুদিন পরেই চাকরি নিয়ে দিল্লিতে চলে যায়।। বিয়ের মাত্র দুই বছর পরই তারা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তাই কোন সন্তান হয়নি । কিন্তু ওর মত শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে চাইলেই পারতো নতুন কাউকে জীবনসঙ্গী করে লাইফটাকে সেটেল করে নিতে। কিন্তু মনের একটা অদ্ভুত জেদ বশত পনেরটা বছর অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস করে কাটিয়ে দিয়েছে সে।

তবে চেহারার জৌলুস দেখে তার প্রপার বয়সটা কিন্তু এখনও বোঝা যায় না। মনে হয় এখনো সে একটা যুবতী মেয়ে। অবশ্য বিয়ে না করলেও সে মাতৃত্বের স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে নি। তাই অনাথ আশ্রম থেকে একটা কন্যা সন্তান দত্তক নিয়েছিল সে। তখন পিকুর বয়স সবেমাত্র তিন বছর ।পিকুই হলো এখন প্রিয়সার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাকে কেন্দ্র করেই এখন তার সুখ-দুঃখ বর্তমানে এগিয়ে চলা । পিকু এইটে পড়ে।

সপ্তাহে এই দিনটা অর্থাৎ রবিবারে নিয়ম করে প্রিয়াসা পিকুকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে যায়, ওকে নিয়েই টুকটাক সাংসারিক ব্যবহৃত জিনিস শপিং করে। কখনো স্কিন কেয়ার, হেয়ার কেয়ার এর প্রোডাক্ট আবার পছন্দ হলে জামাকাপড়ও। এবং সবশেষে রাতে ডিনার করে দিনটা ভালভাবে এনজয় করে মা-মেয়ে বাড়ি ফেরে।পিকু সারা সপ্তাহ জুড়ে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করে। কিছু শপিং কিংবা ভালোমন্দ খাওয়া জন্য নয়,সপ্তাহের ব্যস্ততার পর রবিবারে তার মায়ের মুখে হাসিটা দেখবার জন্য । সে লক্ষ্য করে সারাটা দিন তার মা রান্না বান্না , অফিস, বাড়ি এই সমস্ত কিছু সামলে প্রায় হিমশিম খেয়ে যায়। প্রিয়াসার মুখে এই ক্লান্তি ভাব পিকু কে বড় কষ্ট দেয়। সেও চায় তার মাকে একটু সুখী দেখতে।

অন্যদিকে প্রিয়াসাও ভাবে সারাদিনের কাজের ফাঁকে পিকুকে সে তেমন সময় দিতে পারে না তাই সে অপেক্ষা করে ছুটির দিন টার জন্য।
কিন্তু অন্যান্য রবিবারের মত আজও পিয়াসা পিকুকে নিয়ে শপিং করতে বেরিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবেই রিতেশকে দেখে থমকে যায়। প্রিয়াশা কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারে না রিতেশের স্থায়ী সরকারি চাকরি বরাবরই সে ঘুরতে যাওয়ার বিপক্ষে তাহলে রিতেশ এর পক্ষে কলকাতা ছেড়ে দিল্লিতে আগমন ….ও কি তাহলে ভুল দেখছে। কিন্তু না!! সেই একইরকম চোখ, এক চেহারা ,একই স্টাইলে জামা প্যান্টপড়া এ রিতেশ ছাড়া অন্য কেউ নয়।প্রিয়াসা কে আরো চমকে দিয়ে হঠাৎই রিতেশ প্রশ্ন করে ওঠে–” কি হলো প্রিয়াসা খুব অবাক হয়ে গেলে বুঝি। জানি আমায় এখানে দেখে খুব কৌতূহল হচ্ছে তোমার। তুমি ভাবছো আমার মত কর্মব্যস্ত বেরসিক লোকটা দিল্লির মতো জায়গায় কি করছে তাই তো? যদি বলি এতগুলো বছর পর শুধু তোমাকে একবার দেখব বলে এসেছি।”

প্রিয়াশা এতক্ষণ চুপ করে ছিল এবার সেও বললো–” তুমি জানলে কি করে আমি এখানে থাকি?” ” তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ডে বেরসিক নামে যে ফ্রেন্ড আছে সেই হলো আমি। তুমি তো বলেছিলে উইকেন্ডে মেয়েকে নিয়ে এখানে টাইম কাটাতে আস তাই দেখতে চলে এলাম। দেখেও ভাল লাগল বেশ সংসারী হয়েছ, সুন্দর ফুলের মত মেয়ে হয়েছে তোমার, আমার মত কর্মব্যস্ত বেরসিক কে ছেড়ে সংসারী হয়ে বর, কন্যা নিয়ে খুব সুখেই আছো দেখছি। “কিন্তু আঙ্কেল আমার তো বাবা নেই” পিকুর কথায় অবাক হয়ে যায় রিতেশ। প্রিয়াশা বলতে শুরু করে– “কর্মব্যস্ত মানুষটাকে ছেড়ে এসেছিলাম কিন্তু ভালবাসাটাকে ছেড়ে আসেনি আমি নতুন কোন সংসার পাতি নি। আমি পিকু কে দত্তক নিয়েছি। মা, মেয়ে খুবসুখে আছি “প্রিয়াশা পিকুকে যেমন আপন করে নিয়েছো তেমনি ওর কথা ভেবে ওর বাবা কে কি আবার আপন করে নেওয়া যায় না? চলো না বাকি জীবনটা পিকু কে নিয়ে আবার একসাথে কাটাই।” ” আঙ্কেল তুমি আমার বাবা হবে? বেশ হবে। মা সবসময় কাজে ব্যস্ত মনমরা হয়ে থাকে আমরা এবার থেকে একসাথে থাকব খুব মজা হবে। প্রিয়াশা এতদিনে বুঝে গেছে সংসারের দায়িত্ব নিলে কর্মকর্তাকে কতটা ব্যস্ত থাকতে হয় একটা সংসারকে হাসি-খুশি রাখতে ।সেই অনুশোচনা অনুতাপ থেকেই সে আবার রিতেশ কে আপন করে নেয়।

Leave a Comment